Sunday, 22 February 2026

জুলাই সনদ ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’: কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

 বহুল আকাঙ্ক্ষিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এখন গণভোট। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলই কমবেশি গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালালেও নাগরিকদের মাঝে গণভোট এবং জুলাই সনদ নিয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। গণভোট কী, এতে ‘হ্যাঁ’ দিলে কী পরিবর্তন আসবে কিংবা ‘না’ দিলে কী ঘটবে—এসব প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখকে সামনে রেখে সরকারি ও রাজনৈতিক মহলের জোর প্রচারণা চললেও নাগরিকদের কাছে এই ব্যপারে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা অনুপস্থিত। যেখানে এই গণভোট শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।



জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে গঠিত ১১টি কমিশনের মধ্যে ছয়টির মোট ৮৪টি সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রকাশিত হয়। বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবির প্রতিফলন হিসেবেই এই সনদের ভিত্তি। ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী মানবাধিকার ঘোষণার মতোই এটি গণমানুষের লিখিত প্রত্যাশার দলিল হিসেবে প্রতিফলিত।

জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ৩৮টি রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে যে গণভোটের মাধ্যমে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে গঠিত সরকার জনগণের প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা, সংবিধান, নির্বাচন, বিচার, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কাঠামোতে পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ’নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠার পথ খুলবে এবং জনগণ ভবিষ্যৎ সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে কার্যত বাধ্য করতে পারবে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষাকেও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদ-এর বানান সংশোধন করে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ লেখা হবে। সংবিধান বিলুপ্তি, স্থগিতাদেশ এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে নতুন নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে নাগরিকের জীবন, বিচার ও দণ্ডসংক্রান্ত অধিকারের পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত পরিবর্তনে ’সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’-কে রাষ্ট্রের মূলনীতির অংশ করার কথা বলা হয়েছে। যেখানে বিদ্যমান চার মূলনীতি—ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র—পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও কয়েকটি রাজনৈতিক দল এগুলো অপরিবর্তিত রেখে নতুন মূল্যবোধ যুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছে। অবশ্যই তা জনগনের সম্মতিতেই হবে। ফলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন এবং তিনি স্বাধীনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনার্জি কমিশনের প্রধান নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে গুরুতর অসদাচরণ, রাষ্ট্রদ্রোহ বা সংবিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের সুযোগ থাকবে। ক্ষমা প্রদানের বিশেষ ক্ষমতাও অনেকটা সীমিত করা হবে।

জুলাই সনদ অনুযায়ী একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন এবং একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। এতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমানোর একটি প্রচেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে স্পিকারের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর লক্ষ্য নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করা। এই পরিবর্তন কার্যকর হলে রাজনৈতিক আস্থাহীনতা কমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে আইনসভায় বড় ধরনের রূপান্তরের প্রস্তাব এসেছে। নিম্নকক্ষে থাকবে ২০০ আসন এবং উচ্চকক্ষে ১০০ সদস্য, যারা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষ থেকে প্রস্তাব যাবে এবং উচ্চকক্ষ তা পর্যালোচনা ও সংশোধন করতে পারবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকায় অন্তত ১০ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ধাপে ধাপে সংসদে নারীর অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন এবং দলীয় অবস্থানের বিপরীতে ভোট দেওয়ার সুযোগ সংসদীয় সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

বর্তমান ভৌগোলিক আসন কাঠামোর পরিবর্তে প্রতি ১০ বছর অন্তর আদমশুমারির ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। এতে প্রতিনিধিত্ব আরও বাস্তবসম্মত ও বৈচিত্রমণ্ডিত হতে পারে। একই সঙ্গে উভয় কক্ষের সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ফলে সংসদের বৈধতা ও জবাবদিহিতা বাড়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্য থেকে নির্ধারিত হবেন এবং বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ, উপজেলা পর্যায়ে আদালত সম্প্রসারণ এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ বিচারপ্রাপ্তি সহজ করতে পারে। আদালত ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, আচরণবিধি প্রণয়ন এবং বিচারকদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশের মতো পদক্ষেপ স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সংবিধানের সংশোধনের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্দলীয় কমিশনারদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব এসেছে। স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি নির্ধারিত পদ্ধতিতে কমিশন নিয়োগ করবে। পাশাপাশি একজন সাংবিধানিক ন্যায়পাল নিয়োগ, সরকারি কর্ম কমিশনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং মহাহিসাব রক্ষক নিয়োগের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন, নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং জনপ্রতিনিধির সম্পদের তথ্য প্রকাশ—এসব পদক্ষেপ দুর্নীতিবিরোধী কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে। বেসরকারি খাতে দুর্নীতিকে শাস্তিযোগ্য করার প্রস্তাবও রয়েছে।

জনপ্রশাসনে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ সংশোধন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩ পর্যালোচনা, গণহত্যা ও ভোট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত এবং হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগ পৃথক করার উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের এক দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। স্থানীয় সরকারকে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান এবং নিজস্ব তহবিল গঠনের সুযোগ দেওয়া বিকেন্দ্রীকরণে সহায়ক হতে পারে।

পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, নাগরিক অভিযোগ তদন্ত এবং জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র তদন্ত সার্ভিস, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং আইনগত সহায়তা প্রতিষ্ঠানকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের কথাও বলা হয়েছে।

তবে এই বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যেও শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশের বিপর্যয়, কৃষি, বেকারত্ব, দক্ষ মানবসম্পদ ও গণমাধ্যমের মতো মৌলিক খাতগুলো তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকার সমালোচনা উঠেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন, অথচ এ বিষয়ে কোনো শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়নি। একইভাবে দেশে বিপুল সংখ্যক বেকার তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কার্যকর দিকনির্দেশনাও অনুপস্থিত; যে বিষয়কে কেন্দ্র করে জুলাই গণঅভ্যুত্থনের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের জটিলতা ও ভঙ্গুর অবস্থা থাকা সত্ত্বেও কোনো সংস্কার পরিকল্পনা নেই। কৃষি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্নেও সনদ নীরব থেকেছে। একইসাথে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন এবং নারী অধিকারসংক্রান্ত উল্লেখ্যসংখ্যক যৌক্তিক দাবিগুলোর অনেকটাই অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যা সামগ্রিক সংস্কারের পরিপূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

তবে, সব সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা সত্ত্বেও জুলাই সনদ ২০২৫ রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রচেষ্টা। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে নাগরিকরা নতুন সাংবিধানিক সেবা ভোগের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারবেন; আর ব্যর্থ হলে এই উদ্যোগ অকার্যকর হয়ে পড়বে। তাই গণভোট শুধু একটি ভোট নয়—এটি রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের প্রশ্ন।

পাশাপাশি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের রক্ত এই সনদের নৈতিক ভিত্তিকে আরও গভীর করেছে। তাদের আত্মত্যাগ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং তা বাস্তবায়নের নৈতিক দায় তৈরি করে। সেই রক্তের ঋণ স্মরণ রেখেই সংস্কারকে কার্যকর ও জনগণমুখী করা আজ আমাদের কর্তব্য।

তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বানের পাশাপাশি সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—এতে নাগরিকরা কী ধরনের নতুন সেবা ও কাঠামোগত সুবিধা পাবেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে সংস্কার বাস্তবায়ন অপরিহার্য; কারণ জনগণের ভোটই ভবিষ্যৎ সরকারকে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বাধ্য করবে এবং একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র নির্মাণের পথ সুগম করবে। আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রচষ্টার মাধ্যমেই নাগরিকবান্ধব বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

No comments:

Post a Comment

রক্তঋণের ভাষা: বাজারের যুগে বাংলার জ্ঞান-স্বাধীনতার লড়াই

ফাল্গুনের এই স্মরণীয় মাসে ১৯৫২  ( ১৩৫৮  বঙ্গাব্দে)  সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আবারও আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে...