Sunday, 22 February 2026

রক্তঋণের ভাষা: বাজারের যুগে বাংলার জ্ঞান-স্বাধীনতার লড়াই


ফাল্গুনের এই স্মরণীয় মাসে ১৯৫২ (১৩৫৮ বঙ্গাব্দে) সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আবারও আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত প্রথম উপন্যাসে জহির রায়হানের বর্ণনায় পিজন ভ্যানের মধ্যে আসাদের কণ্ঠে উচ্চারিত সেই আহ্বান—“শহিদ স্মৃতি-- অমর হোক”আর সর্বশেষ বাক্য, ”আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হবো”—আজও বাঙালির মনোজগতে অনুরণিত হয়। ভাষা শহিদদের রক্তাক্ত ও বর্ণাঢ্য ইতিহাসের স্মৃতি নিয়ে প্রকৃতিতে গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে একটুখানি হাসি দিয়ে ফুটে আছে রঙিন সব ফুল। বার্তা দিচ্ছে নতুন ফলের। তেমনি জাতির চেতনাও নতুন করে জেগে উঠেছে আরেকটি ফাল্গুনের আত্ম কাহিনি।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা সত্যিই দ্বিগুণ হয়েছিলাম২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা আরেকবার এই নিরন্তর যাত্রার পুনরাবৃত্তি করেছিলাম। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন। বিশ্বের বুকে সার্বভৌম রাষ্ট্র। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়— স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর পরে এসেও আমরা কি ভাষা শহিদদের স্মৃতি যথার্থভাবে ধারণ করতে পেরেছিনাকি নানা বৈরী বাস্তবতায় তাদের অমর অবদান ভুলতে বসেছিআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আড়ালে আমাদের শহিদ দিবস এবং সেই রক্তদানের যে মহান লক্ষ্য তা অর্জনে আমাদের আমাদের বেহাল অবস্থায় স্মৃতির পাতা থেকে হারিয়ে ফেলছি?

বাংলা ভাষা সবসময়ই ছিল এ অঞ্চলের মাটির ও মানুষের ভাষা। যাদের জীবন ও জীবিকার মৌলিক পাথেয় ছিল বাংলার মাটি পানি বাতাস ও দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ। আর যারা বাংলার মাটিতে থেকে বৈদেশিক সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠেছে কিংবা ধারণ করছে তাদের ভাষা কখনোই মোটাদাগে বাংলা ছিল না। সেই উচ্চবিত্ত শ্রেণির ভাষা সর্বদায় ছিল পরিবেশ ও ক্ষমতার ছত্রছায়ায়। ইতিহাসের নানা পর্যায়ে সংস্কৃতআরবিফারসি ও ইংরেজি বাংলা ভাষার উপর প্রভাব বিস্তার করেছেঅনেক ক্ষেত্রে শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করেছেকখনো বোধগম্যতা ও প্রাণচাঞ্চল্য বাড়িয়েছে। দীর্ঘ বিবর্তন এবং জটিল সব ধাপ পরিক্রম করেই আজেকের বাংলা ভাষার এই অবস্থান। 

কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। প্রশাসনিক রাজনৈতিক এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের মাতৃভাষা বাংলার বিপরীতে চাপিয়ে দেওয়াতৎকালীন পাকিস্তানের উচ্চ শ্রেণির ভাষা উর্দুর বিপরীতে বাংলা ভাষার নিজস্ব স্বতন্ত্রসাংবিধানিক ও রাষ্ট্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিল এই রক্তদান। এই গৌরবময় ভাষা আন্দোলন একইসাথে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রচনার প্রস্তর স্থাপন করেছিলএকইসাথে পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভাষাকে রাষ্ট্রীয় অধিকার স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেওয়ার দাবিকে বৈধতা দিয়েছিল। পুরো পাকিস্তান ্আমলে শহিদ দিবস হিসেবে বাঙালি স্বাধিকার আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপনকারী এই রক্তাক্ত অমর স্মৃতিকে সম্মানের সহিত স্মরণ করা হয়েছে। জনগণের হৃদয় থেকে বরণ করা হয়েছেশহিদের রক্তাক্ত স্মৃতি ও সম্মান।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে চাওয়ার পেছনেএকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের শিক্ষার মাধ্যম কি হবেতাদের চাকরি ক্ষেত্রে এবং প্রশাসনিক বিষয়াবলিতে কোন ভাষার প্রাধান্য দেওয়া হবেবাংলাভাষীরা যেন উর্দু ভাষীদের সাথে প্রতিযোগিতা কিংবা সার্বিক যোগাযোগে কোনোভাবে বৈষম্যের শিকার না হয় সে বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ ছিল। 


আজ বাংলাদেশ স্বাধীন। তবেস্বাধীনতার পর সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হলেও বাস্তবে বাংলা ভাষাকে জ্ঞান-বিজ্ঞানপ্রশাসন ও উচ্চশিক্ষার পূর্ণাঙ্গ ভাষা হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অপরিপক্বতা স্পষ্ট। এমনকি সংবিধানও প্রথমে ইংরেজিতে রচিত হয়ে পরে বাংলায় অনূদিত হয়েছে— এটিই ভাষা বাস্তবতার একটি প্রতীক। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পার হলেও শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা পূর্ণমাত্রায় প্রতিষ্ঠা পায়নি। জে এ লাপন্সের তত্ত্ব অনুযায়ীযে ভাষায় বৈজ্ঞানিক গবেষণামৌলিক বইপ্রযুক্তি উন্নয়ন ও সফট পাওয়ার বা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব তৈরি হয় নাসে ভাষার ক্ষমতা বাড়ে না। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার বিপুল অংশ ইংরেজি মাধ্যমে পরিচালিত হয়অথচ নিজের ভাষায় উচ্চশিক্ষা না হলে জাতির আত্মিক ও সামষ্টিক উন্নতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

চাকরিক্ষেত্রে ইংরেজি দক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হয়কিন্তু বাংলা দক্ষতার মূল্যায়ন কম। এর অর্থ ইংরেজি ত্যাগ নয়বরং বাংলা ও ইংরেজির সমান বিকাশ দরকার। প্রশাসনে এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা বিরাজমান— ইংরেজি ব্যবহারকে আভিজাত্যের চিহ্ন হিসেবে দেখা হয়অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ ইংরেজি ভাষাকে বোধগম্য করে না। আইন শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থায়ও ইংরেজির একচ্ছত্র প্রাধান্যযা মাতৃভাষায় জ্ঞানের চর্চা ও বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি এই মাতৃভাষায় যদি আইন শিক্ষা দেওয়া না হয় তাহলে মাতৃভাষা বা বাংলায় আইনি বিষয়াদির মৌলিক চর্চার চিন্তা করাও নিরর্থক।

বর্তমান সময়ে এসে প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমরা ভাষা শহিদদের স্মৃতি ভুলে যাচ্ছি। ডিজিটাল যোগাযোগে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখার প্রবণতা বাড়ছে। আমাদের ভুলে গেল চলবে না যে ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে বলা হয়েছিল আরবি হরফ বাংলা ভাষার লেখার চর্চা করার কথা। এই সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই আমাদের বাংলা অ্যাকাডেমির প্রাথমিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তবে আমরা এই অপচেষ্টা রেখে দিতে পারলেওকালের বিবর্তনে নিজেদের ভাষার কর্তৃত্ব অন্য ভাষার বর্ণমালা দিয়ে মুছে দিতে চেষ্টা করছি। যে ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া হয়েছেসেই ভাষাকে নিজের বর্ণমালায় না লিখে অন্য বর্ণমালায় প্রকাশ করা দীর্ঘমেয়াদি অপরিণামদর্শী আচরণ। যা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে আমাদের বেখেয়ালি আচরণকেই নির্দেশ করে এবং এই চর্চা আমাদের ভবিষ্যৎকে আরো আধারে নিয়ে যাবে বললে ভুল হবে না। কোন ভাষার স্থায়িত্ব বৃদ্ধি করতে গেলেঅবশ্যই সে ভাষার সাহিত্যকে বৃদ্ধি করতে হয়। ভাষার প্রবহমান বিবর্তনের দিকে সুষ্ঠু নজর রাখতে হয়। অতিরিক্ত পরিবর্তন বা স্থবিরতা উভয়ই ভাষার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলা ভাষা ঠিক সেই দিকেই যাচ্ছে বললে এই মুহূর্তে ভুল বলতে পারলেও আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও আমাদের উৎকণ্ঠা সত্যিই আরো বাড়বে।

 

বাংলা ভাষার এই মহৎ কীর্তির আরেকটি অপরিণামদর্শী চিন্তা হচ্ছে আমরা বাংলা সাল তারিখের পরিবর্তে ইংরেজি সাল তারিখের নামে ভাষা শহিদ দিবসকে স্মরণ করে থাকি। যেহেতু এটি বাংলা ভাষার শহিদদের স্মরণে এবং বাংলা ভাষার মর্যাদায় দিবসটি পালন করা হয়তাহলে ইংরেজি ভাষা বা মাসের নামে এই তারিখ পালনের বিপরীতে বাংলা মাস এবং তারিখের নামে এই দিবস পালন করায় কাম্য। বাংলা ভাষার নিজস্ব বর্ষপঞ্জি বিদ্যমান। সে কথা আমাদের ভুলে গিয়ে বিদেশি বর্ষপঞ্জি অন্তত এখানে ব্যবহার করা কাম্য নয়।

আমরা বর্তমান সময়ে এসে বাংলা ভাষার শহিদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এই দুইটি জিনিসকে একসাথে গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা লক্ষ্য করছি। ভাষা শহিদ দিবস এটি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি দান করেছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম লাভের প্রসব বেদনার পত্তন ঘটিয়েছে এই শহিদ দিবস। আর এই শহিদ দিবসের আন্তর্জাতিক একটি স্বীকৃতির হল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আমাদের কোন জাতীয় দিবস নয়তবে আন্তর্জাতিক। বরং আমাদের নিজেদের রক্ত দিয়ে কেনা দিবস হচ্ছে শহিদ দিবস। আমাদেরকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে গিয়ে শহিদ দিবসের স্মৃতি ভুলে গেলে চলবে না। এই পার্থক্য বোঝা জরুরি।

বাংলা পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা হলেও বাস্তবে এই ভাষা এখনো নিজের পরিধির মধ্যেই পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারেনিবরং অনেক ক্ষেত্রেই অপরিপক্বতার ঘূর্ণিতে আটকে আছে। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলা ব্যবহারের পরিধি সীমিতযেখানে তুলনামূলকভাবে ছোট ইউরোপীয় ভাষাগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে উচ্চতর ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার এই বর্ধিত সুযোগ— একটি ইতিবাচক লক্ষণ। কিন্তু এখনো বাংলা ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কোনো স্বীকৃত পরীক্ষা পদ্ধতি গড়ে ওঠেনিযেমন ইংরেজির জন্য IELTS বা মান্দারিনের জন্য HSK আছে। ফলে বাংলা ভাষার প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা সীমিতই থেকে যাচ্ছে।

আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বে ভাষাও পণ্য। বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে জ্ঞান-বিজ্ঞানসাহিত্যপ্রযুক্তিবিনোদনবাণিজ্যশিল্প প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসন— সব ক্ষেত্রে এর আধিপত্য বাড়াতে হবে। ভাষা শহিদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে দরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। সরকারএকাডেমিয়াগণমাধ্যম ও জনগণ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বে ভাষাও এক ধরনের পণ্য— যে ভাষা জ্ঞান-বিজ্ঞানসাহিত্যপ্রযুক্তিবিনোদনবাণিজ্যশিল্প প্রতিষ্ঠানপ্রশাসন ও বাজারে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে নাসে ভাষা ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। বাংলা ভাষার জন্য এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল আবেগ নয়প্রয়োজন জ্ঞান-বিজ্ঞানসাহিত্যপ্রযুক্তিগণমাধ্যম ও রাষ্ট্রপরিচালনার প্রতিটি স্তরে এর শক্ত অবস্থান তৈরি করা। ভাষা শহিদদের রক্তের ঋণ শোধের প্রকৃত পথ এটাই— বাংলাকে মর্যাদার ভাষা থেকে জ্ঞানের ভাষায় উন্নীত করা।

ইতিহাস আমাদের শেখায়আরবি ও কালক্রমে ফারসি ভাষা মধ্যযুগে গ্রিক পাণ্ডুলিপি অনুবাদ করে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলনিজেদের ভাষায় বিজ্ঞানদর্শন ও সাহিত্য চর্চা করেই তারা বিশ্বে প্রভাব বিস্তার করেছিল। আজকের ইউরোপীয় এবং উত্তর আমেরিকার ভাষাগুলোর আধিপত্যের পেছনেও একই কারণ কমবেশি বিদ্যমান। কালের মান্দারিন ভাষার ক্ষেত্রেও এই কথা সত্য। আমাদেরও একই পথ ধরতে হবে— নিজেদের ভাষায় গবেষণাপ্রযুক্তি উদ্ভাবনমৌলিক গ্রন্থ রচনা এবং আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তোলা। না হলে ভাষা টিকে থাকবে কেবল স্মৃতিতেবাস্তবে নয় পাশাপাশি হারাবে তার বিদ্যমান সামান্য কর্তৃত্বও।

বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ এখনো উজ্জ্বল হতে পারেযদি সরকারএকাডেমিয়াগণমাধ্যম ও জনগণ একসাথে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ভাষা শহিদদের স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়— নিজের ভাষায় চিন্তা করাগবেষণা করানতুন প্রযুক্তি নির্মাণ করা। এই শহিদ দিবসের এই মাসে তাই আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক— বাংলাকে জীবনের সব ক্ষেত্রে শক্ত ও প্রাণচঞ্চল ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। তবেই শহিদদের রক্তের প্রতি সত্যিকারের সম্মান জানানো সম্ভব হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ও গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ


জুলাই সনদ ও গণভোটে ‘হ্যাঁ’: কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

 বহুল আকাঙ্ক্ষিত ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক পরিসরে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় এখন গণভোট। নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রায় সব রাজনৈতিক দলই কমবেশি গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালালেও নাগরিকদের মাঝে গণভোট এবং জুলাই সনদ নিয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। গণভোট কী, এতে ‘হ্যাঁ’ দিলে কী পরিবর্তন আসবে কিংবা ‘না’ দিলে কী ঘটবে—এসব প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখকে সামনে রেখে সরকারি ও রাজনৈতিক মহলের জোর প্রচারণা চললেও নাগরিকদের কাছে এই ব্যপারে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা অনুপস্থিত। যেখানে এই গণভোট শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।



জুলাই গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে গঠিত ১১টি কমিশনের মধ্যে ছয়টির মোট ৮৪টি সুপারিশের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রকাশিত হয়। বাঙালি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবির প্রতিফলন হিসেবেই এই সনদের ভিত্তি। ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী মানবাধিকার ঘোষণার মতোই এটি গণমানুষের লিখিত প্রত্যাশার দলিল হিসেবে প্রতিফলিত।

জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী ৩৮টি রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে যে গণভোটের মাধ্যমে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে গঠিত সরকার জনগণের প্রত্যাশিত সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা, সংবিধান, নির্বাচন, বিচার, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন কাঠামোতে পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় ’নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ প্রতিষ্ঠার পথ খুলবে এবং জনগণ ভবিষ্যৎ সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে কার্যত বাধ্য করতে পারবে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভাষাকেও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ‘বাংলাদেশী’ জাতীয়তাবাদ-এর বানান সংশোধন করে ‘বাংলাদেশি’ জাতীয়তাবাদ লেখা হবে। সংবিধান বিলুপ্তি, স্থগিতাদেশ এবং জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষেত্রে নতুন নীতিমালা গ্রহণের মাধ্যমে নাগরিকের জীবন, বিচার ও দণ্ডসংক্রান্ত অধিকারের পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং সকল সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাংবিধানিক কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত পরিবর্তনে ’সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’-কে রাষ্ট্রের মূলনীতির অংশ করার কথা বলা হয়েছে। যেখানে বিদ্যমান চার মূলনীতি—ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র—পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও কয়েকটি রাজনৈতিক দল এগুলো অপরিবর্তিত রেখে নতুন মূল্যবোধ যুক্ত করার পক্ষে মত দিয়েছে। অবশ্যই তা জনগনের সম্মতিতেই হবে। ফলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তায় অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন এবং তিনি স্বাধীনভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনার্জি কমিশনের প্রধান নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে গুরুতর অসদাচরণ, রাষ্ট্রদ্রোহ বা সংবিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের সুযোগ থাকবে। ক্ষমা প্রদানের বিশেষ ক্ষমতাও অনেকটা সীমিত করা হবে।

জুলাই সনদ অনুযায়ী একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন এবং একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। এতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কমানোর একটি প্রচেষ্টা প্রতিফলিত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৩০ দিন আগে স্পিকারের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর লক্ষ্য নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করা। এই পরিবর্তন কার্যকর হলে রাজনৈতিক আস্থাহীনতা কমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা বাড়বে।

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে আইনসভায় বড় ধরনের রূপান্তরের প্রস্তাব এসেছে। নিম্নকক্ষে থাকবে ২০০ আসন এবং উচ্চকক্ষে ১০০ সদস্য, যারা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। কোনো আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষ থেকে প্রস্তাব যাবে এবং উচ্চকক্ষ তা পর্যালোচনা ও সংশোধন করতে পারবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে উচ্চকক্ষের প্রার্থী তালিকায় অন্তত ১০ শতাংশ নারী অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ধাপে ধাপে সংসদে নারীর অংশগ্রহণ ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন এবং দলীয় অবস্থানের বিপরীতে ভোট দেওয়ার সুযোগ সংসদীয় সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

বর্তমান ভৌগোলিক আসন কাঠামোর পরিবর্তে প্রতি ১০ বছর অন্তর আদমশুমারির ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। এতে প্রতিনিধিত্ব আরও বাস্তবসম্মত ও বৈচিত্রমণ্ডিত হতে পারে। একই সঙ্গে উভয় কক্ষের সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার ফলে সংসদের বৈধতা ও জবাবদিহিতা বাড়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

প্রধান বিচারপতি আপিল বিভাগের বিচারকদের মধ্য থেকে নির্ধারিত হবেন এবং বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ, উপজেলা পর্যায়ে আদালত সম্প্রসারণ এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ বিচারপ্রাপ্তি সহজ করতে পারে। আদালত ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, আচরণবিধি প্রণয়ন এবং বিচারকদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশের মতো পদক্ষেপ স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

সংবিধানের সংশোধনের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্দলীয় কমিশনারদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রস্তাব এসেছে। স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা এবং আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত কমিটি নির্ধারিত পদ্ধতিতে কমিশন নিয়োগ করবে। পাশাপাশি একজন সাংবিধানিক ন্যায়পাল নিয়োগ, সরকারি কর্ম কমিশনে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং মহাহিসাব রক্ষক নিয়োগের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, স্বার্থের দ্বন্দ্ব প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন, নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং জনপ্রতিনিধির সম্পদের তথ্য প্রকাশ—এসব পদক্ষেপ দুর্নীতিবিরোধী কাঠামোকে শক্তিশালী করতে পারে। বেসরকারি খাতে দুর্নীতিকে শাস্তিযোগ্য করার প্রস্তাবও রয়েছে।

জনপ্রশাসনে তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ সংশোধন, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-১৯২৩ পর্যালোচনা, গণহত্যা ও ভোট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত এবং হিসাব ও নিরীক্ষা বিভাগ পৃথক করার উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের এক দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। স্থানীয় সরকারকে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান এবং নিজস্ব তহবিল গঠনের সুযোগ দেওয়া বিকেন্দ্রীকরণে সহায়ক হতে পারে।

পুলিশ সংস্কারের ক্ষেত্রে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, নাগরিক অভিযোগ তদন্ত এবং জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রয়েছে। বিচার বিভাগের জন্য স্বতন্ত্র তদন্ত সার্ভিস, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং আইনগত সহায়তা প্রতিষ্ঠানকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের কথাও বলা হয়েছে।

তবে এই বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যেও শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশের বিপর্যয়, কৃষি, বেকারত্ব, দক্ষ মানবসম্পদ ও গণমাধ্যমের মতো মৌলিক খাতগুলো তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকার সমালোচনা উঠেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন, অথচ এ বিষয়ে কোনো শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়নি। একইভাবে দেশে বিপুল সংখ্যক বেকার তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য কার্যকর দিকনির্দেশনাও অনুপস্থিত; যে বিষয়কে কেন্দ্র করে জুলাই গণঅভ্যুত্থনের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের জটিলতা ও ভঙ্গুর অবস্থা থাকা সত্ত্বেও কোনো সংস্কার পরিকল্পনা নেই। কৃষি ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্নেও সনদ নীরব থেকেছে। একইসাথে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন এবং নারী অধিকারসংক্রান্ত উল্লেখ্যসংখ্যক যৌক্তিক দাবিগুলোর অনেকটাই অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যা সামগ্রিক সংস্কারের পরিপূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

তবে, সব সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা সত্ত্বেও জুলাই সনদ ২০২৫ রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রচেষ্টা। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে নাগরিকরা নতুন সাংবিধানিক সেবা ভোগের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সরকারকে সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য করতে পারবেন; আর ব্যর্থ হলে এই উদ্যোগ অকার্যকর হয়ে পড়বে। তাই গণভোট শুধু একটি ভোট নয়—এটি রাষ্ট্রের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের প্রশ্ন।

পাশাপাশি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের রক্ত এই সনদের নৈতিক ভিত্তিকে আরও গভীর করেছে। তাদের আত্মত্যাগ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতিকে শুধু রাজনৈতিক অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং তা বাস্তবায়নের নৈতিক দায় তৈরি করে। সেই রক্তের ঋণ স্মরণ রেখেই সংস্কারকে কার্যকর ও জনগণমুখী করা আজ আমাদের কর্তব্য।

তাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বানের পাশাপাশি সরকারকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—এতে নাগরিকরা কী ধরনের নতুন সেবা ও কাঠামোগত সুবিধা পাবেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে সংস্কার বাস্তবায়ন অপরিহার্য; কারণ জনগণের ভোটই ভবিষ্যৎ সরকারকে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বাধ্য করবে এবং একটি সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র নির্মাণের পথ সুগম করবে। আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রচষ্টার মাধ্যমেই নাগরিকবান্ধব বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

Tuesday, 9 December 2025

আজ রোকেয়া দিবস

 আজ ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, রোকেয়া দিবস। জাতীয় ও বিভিন্ন পর্যায় থেকে উদ্‌যাপিত হয়েছে দিনটি।

সারাদিন, আমার ব্যক্তিগত, অ্যাকাডেমিক, এবং টুকটাক প্রোফেশনাল জীবন নিয়ে বেশ কেটে গিয়েছে দিনটি। সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করে দেখি বেগম রোকেয়াকে নিয়ে বেশ উত্তপ্ত নিউজ ফিড। তাঁর বিরোধীদের বক্তব্য ও প্রচারণায় বেশ চোখে পরার মতো। আমি সচরাচর ইত্যাদি আধেয় এড়িয়ে চলি, তবে আজ লিখছি।

আমি একটা জিনিস বেশ জোর দিয়ে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশে যারা তাঁকে মাথায় নিয়ে নাচে এবং যারা পায়ের তলায় পিশতে চায় তাদের শতকরা ৯৮ জন বেগম রোকেয়ার লেখা আগাগোড়া পড়েনি।



আমার ‘সৌভাগ্যক্রমে’ কিংবা ‘দুর্ভাগ্যক্রমে’ তাঁর লেখাগুলো পড়ার সুযোগ হয়েছিল। তাঁকে আমার কাছে কখনোই এড়িয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব মনে হয়নি। বরং তাঁকে আমি বেশ শ্রদ্ধা করি এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁকে কৃতিত্ব দিতে চাই।

একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁকে আমি সর্বদায় আমার নিরপেক্ষ ক্রিটিকেল অবস্থান থেকে দেখতে পছন্দ করি। কখনো তাঁকে পূজনীয় মনে হয়নি, আবার কখনো মনের কোণে তাঁর প্রতি বিন্দু পরিমাণ বিদ্বেষ সৃজন হয়নি। আমি তাঁকে অন্যান্য লেখক, দার্শনিক, গবেষক ও চিন্তককে যেভাবে দেখি, সেভাবেই দেখার চেষ্টা করি।

আমাদের মাঝে সহনশীলতার অভাব বেশ দীর্ঘদিনের এবং অনেক তীব্র। আমরা নিজেদের চিন্তার, মতের, বিশ্বাসের, চর্চার, রুচির, দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে অন্য কোনোকিছু মেনে নিতে পারি না। এমনকি আমাদের কাছে মানুষের পোশাকের বিষয়েও বেশ কট্টর অবস্থান লক্ষণীয়। যে কারণে আমাদের মাঝে এমন একটা ভাব বিদ্যমান যে, আমার নিজেরাই কেবল সত্য, আর দুনিয়ার বাকি সব ভুল। বাকি সবাইকে আমার মতো হতে হবে। নয়তো আমাদের নিজেদের কারো মতো হতে হবে ঠিক হওয়ার জন্য। আমাদের কাছে আমাদের ধারণাগুলো এতই অস্পষ্ট যে, আমরা কেবল রেট রেসের মতো কোনো কিছু অনুসরণ করে যাই। এক দণ্ড দাঁড়িয়ে চিন্তার অবকাশ পায় না। 

আজকাল আমার কাছে মনে হয়, বেগম রোকেয়াকে নিয়ে আমাদের মাঝে এক ধরনের উগ্রতা পরিলক্ষিত। যে-কোনো বিষয়ে বেগম রোকেয়াকে টেনে তাকে গালি দেওয়ার এক ধরনের চর্চা আমাদের মাঝে দেখা যাচ্ছে। ৫ই আগস্টের পর হয়ত কিছুটা বেড়েছে। তবে আমার কথা হলো : বেগম রোকেয়া তো আর গালি জীবনে কম খাননি। তাঁর মৃত্যুর পরও এই চর্চা আমাদের সমাজ অব্যাহত আছে। তবে তাঁর ইচ্ছাগুলো কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশে তাঁকে নিয়ে আরো গঠনশীল কাজ করার সুযোগ ছিল, তবে ঠিক করে হচ্ছে না বলে আমার ধারণা। আর অন্যান্য নারীদের অবস্থা আরো সূচনীয়।

তাঁকে ধর্মবিদ্বেষী বলে প্রচার করার প্রচেষ্টা একটি পুরাতন হাতিয়ার। আজ বেশ কয়েকটি পোস্ট দেখলাম তাঁকে ইসলাম বিদ্বেষী বলে প্রচার করা হচ্ছে। তবে এই ব্যাপারে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিমত রয়েছে। তিনি ইসলাম ধর্মকে প্রমুট করে বেশ লেখা লিখেছেন। তিনি সর্বদাই ধর্মান্ধদের অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন, যেহেতু তিনি ধর্মের নামে নারীদের উপর করা জুলুমের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন, কলম ধরেছেন, পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসলাম ধর্ম যে অধিকার নারীকে দিয়েছে সে অধিকারও আমাদের সমাজের পুরুষগণ নারীদের বঞ্চিত করেছেন। এই চর্চা এখনো বিদ্যমান। বাংলার ঘরে ঘরে নারীর উপর পুরুষ কতৃত্বের অপব্যবহার করেছে এবং করছে, এক অপরের প্রতি দায়িত্বের বরখেলাপ করছে। তৎকালীন হিন্দু সমাজে সতীদাহ প্রথার কথা একবার চিন্তা করতে পারেন।

আমার কাছে বেগম রোকেয়ার লেখা ভালো লাগার দুটি বিশেষ কারণ আছে বলে, হঠাৎ মনে হচ্ছে। এক, তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম দিককার কোনো মুসলিম নারী, যিনি স্বজাতির ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেছেন, আর দুই, তিনি সেইসময় যেভাবে কলম চালিয়েছেন, এখনো আমাদের সমাজের বিভিন্ন অংশে এই ধরনের চিন্তা করা দুরূহ।

আমার কাছে তাঁর নিজের লেখা ও তাকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই পড়ে, তাঁকে যথার্থ ধার্মিকই মনে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়, কেন না জানি, আল্লাহ ভালো জানেন, তাঁকে যারা উলঙ্গ সমালোচনা করেন তাঁদের অনেকের অপেক্ষা তিনি ভালো মুসলমানের ভূমিকায় আবর্তিত ছিল। নিজের মাঝে এক ধরনের মুসলমানি পরিচয় ধারণ করতেন, যা এখনকার আমাদের মাঝে যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আছে তার পাথেয় হতে পারে বলে আমার ধারণা। আমার মনে হয় এখনো অবধি আমরা ঠিক করে তাঁকে বুঝতে পারিনি। তাঁকে নিয়ে বহির্বিশ্বে কাজ করার প্রবণতা যতটুকু, সে হারে আমাদের এখানে অপ্রতুল।

আজ একটা লেখা নিয়ে অনেক প্রচারণা দেখলাম। তিনি বলেছেন “তারপর মহাত্মা মহম্মদ আইন প্রস্তুত করিলেন যে ‘রমণী সর্ব্বাদায় নরের অধীনা থাকিবে, বিবাহের  পূর্ব্বে পিতার কিংবা ভ্রাতার অধীনা, বিবাহের পর স্বামীর অধীনা, স্বামী অভাবে পুত্রের অধীনা থাকিবে।’ আর মূর্খ নারী নত মস্তকে ঐ বিধান মানিয়া লইল।”

 

উল্লেখ, লেখাটি বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ‘রোকেয়া রচনাবলী’ (আমার কাছে ২০১৫ সালে প্রকাশিত পূণর্মূদ্রণ সংস্করণটি আছে)-এর ৬১১ পৃষ্ঠায় বিদ্যমান। যা কিনা তাঁর কোনো গ্রন্থিত লেখার অংশ না। বরং, চিঠি আকার প্রবন্ধটি (অলঙ্কার না Badge of slavery) ভাগলপুরস্থ সম্ভ্রান্ত মোসলমান পরিবারের একটি মহিলা হইতে প্রাপ্ত। যেখানে তিনি কেবল ইসলাম ধর্ম নিয়েই কথা বলেন নি বরং সনাতন, খ্রিষ্ট ইত্যাদি ধর্ম নিয়েও কথা বলেছেন।

আমার ব্যক্তিগতভাবে উক্ত বক্তব্যের উপর কোনো মন্তব্য নেই। তবে সম্পর্কিত আধেয়ের উপর আমার কিছু সমালোচনা আছে। তিনি উক্ত চিঠি আকার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, স্রষ্টা কেন পয়গম্বরকে পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্য বলতে চাই না) কিছু দেশে পাঠিয়েছেন, কেন তাদের বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে পাঠাননি, নবিরা কেন এশিয়াতে সীমাবদ্ধ। সে সম্পর্কে আমার মত হলো, এই কথা সত্য নয়। বস্তুত, আল্লাহ তাঁর নবিদের কেবল এশিয়াতেই প্রেরণ করেনি। তিনি পবিত্র কুরআনে সূরা আল-হুজুরাত (৪৯), আয়াত ১৩-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছেন, যেন তারা একে অপরকে চিনতে পারে, অহংকার করার জন্য নয়, বরং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পারে, কারণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই, যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু (তাকওয়াসম্পন্ন)। পাশাপাশি তিনি পবিত্র কোরানে কেবল গুটিকয়েক নবীর নাম উল্লেখ করেছেন। যেখানে শাস্ত্রমতে নবিদের সংখ্যা এক লক্ষ পঁচিশ হাজারের ন্যায়। সুতরাং তিনি তাদের সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে দিয়েছেন বলেই আমার বিশ্বাস।

উল্লেখ, নবি ইউসুফ আ. ও নবি মূসা আ. কিন্তু আফ্রিকাতে ছিলেন দীর্ঘ দিন। আমাদের জাতীয় কবিও বিবাহের পেছনে আমার ন্যায় একই অবস্থান থেকে হিন্দু ধর্মের অনুসারী নারীকে বিয়ে করেছিলেন।

আমি অনুরোধ করব, কাউকে বুঝতে চাইলে ৬০০ পৃষ্ঠার বেশি একটি বইয়ের (একজন লেখকের লেখারও) ৬০ শব্দেরে আশেপাশের কোনো লেখা পড়ে বিচার করা ঠিক হবে না। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন আমাদের সাহিত্য, চিন্তা ও দর্শনের এক অমূল্য সম্পদ। যিনি আমাদের সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে দেখিয়েছেন। ধর্মের নামে, অপব্যাখ্যা দিয়ে, অন্যায়কে জায়েজ করে দুনিয়াতে অপচর্চা করা যায় বটে, তবে আল্লাহর বিচার নিশ্চয়ই যথার্থ। মহান আল্লাহ পাক বেগম রোকেয়ার পরলোকের সহায় হোক। আমাদের প্রতি রহমত বর্ষিত হোক, যাতে করে আমরা আমাদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে সত্য ও ন্যায়ের দিকে অগ্রগামী হতে পারি।








Friday, 21 November 2025

ভূমিকম্প ও আমাদের চিন্তার বেহাল দশা


 এধরনের ভূমিকম্প আমাদের প্রজন্ম আগে কখনোই দেখেনি। শেষবার যখন বড় ভূমিকম্প হয় তখন আমার বাড়ির পাশের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে আজ যমুনা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তা না হয় আমার জীবন চক্র অন্যভাবেও কাটতে পারতো!

যাইহোক, আমরা যে জাতি হিসেবে কত ‘মূর্খ’ তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে তথাকথিত দেশে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আচরণের মাধ্যমে। যেখানে কেউ কেউ এই দূর্যোগকে ধর্মীয় দৃষ্টি থেকে কেবল দেখছে অন্যদিকে সুযোগ কিছু লজিকেল ফ্যালাসি দিয়ে নিজের হীন স্বার্থ উদ্ধারে ট্রমাটাইজড লোকজনেরৃ মানসিক অবস্থাকে ব্যবহার করছে। যেখানে স্পষ্টতই আমাদের এই দুর্যোগের পর কী ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যদি আফটার শক হয় তা হলে কী করতে হবে, দীর্ঘমেয়াদী আমাদের প্রস্তুতি কী হেবে, আমাদের সার্বিক ঘাটতিগুলো কোথায় তা নিয়ে আলোচনা না করে, স্বার্থান্বেষীদের চক্রান্তে আত্ম নিমজ্জিত।

প্রথমত, আজ ভূমিকম্পের পর আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, অগ্রজ ও অনুজদের কী অবস্থা, বিশেষ করে ‘মৃত্যুঁফাদ‘ আমাদের আবাসিক ভবনগুলোর খবর নিতে ফেইসবুকে যায়। দেখি, একদল দোষারোপ করছে রাজুতে সকামিতার বিষয়ে অবস্থানের কারণে; আরেকদল বলছে বিভিন্ন মাদ্রাসায় বলাৎকারের ঘটনার কারণে এই ভূমিকম্প হয়েছে।

দ্বিতীয়বার ফেইসবুকে ঢ়ুকে দেখি, ওড়না আর প্যান্ট নিয়ে ‘মারামারি’। বিখ্যাত ‘চিন্তাশীল’ সম্প্রদায়ের মধ্যে বাগ্ যুদ্ধ। যেখানে এক নারীর “ভূমিকম্প হইলে মানুষ জান বাঁচায় আর মেয়েরা ওড়না খুঁজে।” এধরনের মন্তব্য নিয়ে বেশ জোর আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যটি জুড়ে।

এখন আসছি, প্রথমবারের কথায়, যেখানে আমাদের দেশের ভূভাগ দীর্ঘসময় যাবৎ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘ সময় যাবৎ আমাদের কিছু বিশেষজ্ঞ নিয়ে আলোচনাও করছে। পত্র পত্রিকায় কিছু কলামও দেখেছি। তবে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চিন্তা করার, আলোচনা করার মানুষ হাতগোনা । আর সারাদিন রিলস দেখা, নর্তকির নাচ দেখা, স্থূল বিষয়াদির প্রতি নিবদ্ধ আলোচনাই সবদিকে। কে কাকে বিয়ে করেছে, কার সাথে কার যৌন-ঘটনা নিয়ে কেলেঙ্কারী হয়েছে, কোথায় কার লিংক ভাইরাল হয়েছে এসব বিষয়েই অধিকাংশ মানুষের চিন্তার অভাব হয় না, খোঁজার প্রয়োজন নেই এসব মানুষের, আমাদের চারপাশে আছে অহরহ।

এই ঘটনার পেছনে সমকামিতার দোষ, নাকি বলাৎকারের দোষ সেটি আল্লাহ পাক ভালো জানেন। আমার চোখে দুটুই সমান অপরাধ। আল্লাহর আইনে বিচার আছে, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনেও বিচার আছে। বিচার হীনতার সংস্কৃতি ও সুস্থচর্চার অভাবেই আমাদের সমাজে এই ধরণের অপরাধ ও অবস্থা বিরাজ করছে। এখানে একজনের দোষ, আরেকজনকে দিয়ে দোষ কাটানোর কোনো পাথেয় নেই।

এবার আসি দ্বিতীয়বারের কথায়, আমি দু তলায় থাকি। ভূমিকম্পের সময় বেসিনে হাত ধৌত করছে নাস্তা করার জন্য। ভূমিকম্প অনুভূত হতেই আম্মাকে ডেকে বারান্দায় দৌড় দেই। আম্মার হতে ছিল ছুরি আর লেবু। শকটা থামলে আম্মু হাতের জিনিস রেখে বের হতে যাচ্ছে, আর আমায় বলছে চাবির কথা। আমি বললাম চাবি আছে এক রিং আমার পকেটে তুমি রেডি হও। আম্মু যখন জুতা পড়ছে আমি তখন দরজা খুলছি। আর আমি যখন জুতা পড়ছি তখন আম্মু দাড়িয়ে আছে দরজা খুলে। ইতোমধ্যে ছয় তালা থেকে প্রতিবেশিরাও নামে যাচ্ছে আমাদের আগে।

বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমাদের ভবনে বিভিন্ন কেসিমের লোকই বসবাস করে। সবাই যারা যার ভাবে নেমে এসেছে। নিচ তলায় নেমে দেখি একজন হাতে করে জুতা নিয়ে এসে পার্কিং-এ দাঁড়িয়ে জুতা পড়ছে। যা আমরা সময় নষ্ট করে বা থেকে পড়ে বেরিয়ে ছিলাম। নিচে সবাই বসায় যা পড়ে সেভাবেই বেরিয়ে এসছি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে যারা পর্দা করে তারা মুখে নিকাব দিচ্ছে; কেউ আগে থেকেই পরিপাটি, কেউ সচরাচর যেখাবে থাকে সেভাবেই আছে। স্মৃতি থেকে বলছি। কারণ এরকম মুহূর্তে কেউ কারো পোশাকের দিকে নজর দিচ্ছে না বৈকি। সবাই স্বজনদের কল করে খবর নিচ্ছে। কোলের শিশুকে বাবা কোলে নিয়ে বাচ্চার মাকে স্বান্ত্বনা দিচ্ছে। হতচকিত অবস্থায় কী অনুভূতি হয়েছিল, কে কী করছেল সেসব নিয়ে বলছিল। সবাই ছিল আতঙ্কিত।


এখন কথা হলো, আমার ঠান্ডা মাথায় ঢ়ুকে না যে, পরিবারের কোনো পুরুষ এরকম সময় তার স্বজনকে ওড়নার জন্য চাপ দিচ্ছে। আর যদি এমন কেউ হাইপোথেটিকেললি থেকেও থাকে তাহলে সে তার স্বজনকে বাসায় রেখে নিচে নেমে যাবার কথা না কোনো ভাবেই। আমি কাউকে ডিফেন্ড করছি না। আর যারা ওড়না সবসময় ব্যবহার করে তাহলে তাদের ওড়না তো আর কোথায় সুরক্ষিত আছে যা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খোঁজে বের করতে হবে। হাতের নাগালেই থাকার কথা।

এই ধরনের, লিজিক্যাল ফ্যালাসি জনমনে কেবল বিভ্রান্তিই সৃজন করবে। যা মূল বিষয় থেকে তাদের চিন্তা ভাবনাকে ভুল বা সম্পর্কিত তা এমন বিষয়ে প্রবাহিত করবে। কারো ব্যক্তিগত ধারণাকে ধর্মীয় লেবাসে মাখিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয় সংস্কৃতির, মূল্যবোধের ক্ষতি হরা হচ্ছে। যেখানে কোনো বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাহীন সংস্কৃতি বিদ্যমান সেখানে এধরনের সার্ফেস লেবেলর আলোচনাই সুভা পায়।

দ্বিতীয়ত, সব বিষয়ে নারীবাদী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা নারীবাদের দীর্ঘ চর্চিত একটি বিষয়। জেন্ডারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এই অন্যতম মূল আধেয় এখানে। উল্লেখ, আমার প্রথমমে কোটেড বাক্যটি পরার পর আমার ‘ রোকেয়া রচনাবলী’-তে পড়া আবরোধ-বাসিনী গ্রন্থটির কিছু গল্পের কথা মনে হলো। আজকাল আবার কিছু অতি পণ্ডিত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। আমার বিশ্বাস তারা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সবগুলো লেখা পড়ে নাই। এমনকি যারা তাকে অন্ধভাবে সাপোর্ট করে তাদেরও অধিকাংশ না। যায় হোক, আমি বুঝতে পাররাম এমন সেন্সেটিভ সময়ে এই ধরনের উক্তি জনমনে কীধরণের প্রভাব ফেলবে। ঘটলোও তাই।

তবে বাস্তবতা হলো যুগ বদলেছে। আজ যারা পর্দা করে তারাও কোনো অংশে কম শিক্ষিত নয়। তাদের জীবনাদর্শ, পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনাও বেশ তীক্ষ্ণ আনেক ক্ষেত্রে । আমাদের এখানে সমস্যা হলো কেউ কারো সম্পর্কে সুষ্ঠাভাবে জানে না, কেউ কাউকে অধ্যয়ন করে না। সহিষ্ণুতা আমাদের এখানে বেশ সীমিত। সবাই ভাবে আমাটা ঠিক আর বাকি সব বেঠিক।  

এখন আসা যাক আমাদের এই মদনমুখী আলোচনা আমাদের কী কাজে লেগেছে? জাপানে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩টি ভূমিকম্প হয়, তবে এগুলোর বেশিরভাগই এত মৃদু যে তা অনুভব করা যায় না। তবে বছরে প্রায় ১,৫০০টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে অনেকগুলোই শনাক্ত করা যায় না। সাধারণত, রিখটার স্কেলে ৩.০ থেকে ৩.৯ মাত্রার ভূমিকম্পগুলোই বেশি ঘটে, যেখানে বছরে প্রায় ১৬০টি ভূমিকম্প ৫.০ বা তার বেশি মাত্রার হয়ে থাকে।

আল্লাহর রহমতে, আমাদের এখানে সেইধরনের ভৌগোলিক বাস্তবতা অনুপস্থিত, তবে এও সত্য যে আমাদের দেশ, গঙ্গা নদীর বেসিন, পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। যেখানে ১৯৭০ সালে ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশে যে এক নিরব বৈপ্লবিক সাফল্য অর্জন করেছে সেরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতি জরুরী। আজ শিশুরাও ভূমিকম্পের পর দৌড়ে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার তথ্য জানে, যা বেশ কয়েকজন ৪০/৫০+ লোকের না জানার মতো অবস্থা দেখেছি। যেখানে তাদের পাঠ্যবইয়ে এইসব বিষয় শিক্ষা দেওয়ার ফল।  

এমন এক সময়ে আমাদের ঘর থেকে বের হয়ে খোলা আকাশ পাওয়া দুঃসাধ্য এক অবস্থা। যারা পুরান ঢাকায় নিহত হয়েছে তারা বাসা রেলিং ধদে নিহত হয়েছে। আমি জানি না তারা কি ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিনা। আমি অনেককে ঘর থেকে বেরিয়ে রেলিং-এর নচেই দাড়িয়ে থাকতে দেখেছি। কারণ ঢাকা শহরে খোলা জায়গার বড়ই অভাব। উপশহরগুলোরও একই অবস্থা হচ্ছে।

ভূমিকম্প আজ মানুষদের অনেকেই মৃত্যু ভয়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির কাছে যে মানুষ কত তুচ্ছ তা আজ ভূমিকম্পে আবার অনুভূত হয়েছে ঢাকাও আশেপাশের এলাকার মানুষের কাছে। তবে প্রকৃতির সাথে অভিযোজনের মাধ্যমেই মানুষ নিজের সভ্যতাগুলো গড়ে তুলেছে। পৃথিবীতে অবস্থান করছে সহস্রাব্দ যাবৎ। আমাদের এই-ধরনের ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দূর্যোগের হাত থেকে বাচাঁর জন্য যতটুকু সম্ভব পূর্ব-প্রস্তুত নিতে হবে। সবকিছু ডিভাইন না ভেবে বাস্তবের সাথে  নিজেদের সম্পৃক্ত করাই কাম্য এখানে। পাশাপাশি নিজের হীনস্বার্থ ব্যাতিরেকে সার্বিক কল্যাণের দিকেই মনোনিবেশ করাই করণীয়।

A rescue official clears the debris from roof and wall collapse after an earthquake in Dhaka, Bangladesh, November 21, 2025 [Abdul Goni/AP Photo]

আমাদের মাঝে বিভেদ যতস্পষ্ট, আমাদের কল্যাণ ততই দূরবর্তী। আমাদের এখন ঠুটকু জিনিস অপেক্ষা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। আমাদের শহেরে কতটুকু জায়গা খোলো থাকবে, কতটুকুতে মানুষ আবাসন বানাবে, সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য নগরীতে কীভাবে একটু শ্বাস নেওয়া যাবে। আমরা ইতোমধ্যে দেরি করে ফেলেছি। আমাদের সমস্যার সমাধান আমাদেরই করতে হবে। এই লক্ষ্যে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। জনতা সরকারের উভয়েরই দায়বদ্ধতা আছে এখানে।

শেষ করতে চাই নবী (স.)- এর একটি হাদিসের মাধ্যমে। "যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কিয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করবে" (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৪৭৯)। আল্লাহ আমাদের নেক বুদ্ধি নসিব করুক, দুর্যোগ অপেক্ষা হেফাজত করুক।

Saturday, 7 June 2025

কুরবানির আধ্যাত্মিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য


ইসলামে কুরবানি কেবল একটি ধর্মীয় ইবাদত নয়, বরং এটি মানবজীবনের জন্য এক আধ্যাত্মিক তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) ও হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর বিস্ময়কর আত্মত্যাগ, তাঁদের আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য, এবং অন্তরের তাকওয়ার যে দৃষ্টান্ত ইসলাম বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করে—তাই কুরবানির মূল শিক্ষা। এটি কোনো পশু জবাইয়ের আচার নয়, বরং একান্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ত্যাগ ও আত্মসমর্পণের বহিঃপ্রকাশ।

হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর জন্ম এমন এক সমাজে, যেখানে মূর্তিপূজা ছিল সামাজিকভাবে গৃহীত ও ধর্মীয় রূপে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর পিতা আযর ছিলেন একজন মূর্তি নির্মাতা। এমন প্রেক্ষাপটে তিনি দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যান তাওহীদের পক্ষে। কুরআনে আল্লাহ বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তিনি যুক্তি ও প্রজ্ঞা দিয়ে তাঁর কওমকে প্রশ্ন করেন, চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন, আর দেখান যে যেসব জিনিস সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র ইত্যাদি—সেগুলোর ক্ষণস্থায়ী সত্তা কখনো উপাসনার উপযোগী হতে পারে না। একমাত্র সেই সত্তাই উপাসনার যোগ্য, যিনি চিরস্থায়ী, অদৃশ্য, সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান—তিনি আল্লাহ।

এই বিশ্বাসের প্রয়োগ দেখা যায় তাঁর জীবনে। নমরূদের বিশাল অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস, কিংবা প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আঃ)-কে কুরবানির জন্য প্রস্তুত হওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্ত—সবই প্রমাণ করে যে হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর বিশ্বাস ছিল কেবল কথার নয়, কাজের, আত্মনিবেদনের। কুরআনে হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-কে ‘খলিলুল্লাহ’—আল্লাহর বন্ধু বলা হয়েছে। আর এ বন্ধুত্ব এসেছে তাঁর তাওহীদের প্রতি অবিচলতা, আত্মত্যাগ ও আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতার মাধ্যমে। আজও মুসলিম উম্মাহর জন্য তাঁর জীবন হয়ে আছে এক প্রেরণার উৎস, এক চিরন্তন আদর্শ।



কুরবানির অন্তর্নিহিত মূল শিক্ষা হলো—আল্লাহর আদেশের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য। কুরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহর নিকট পশুর গোশত ও রক্ত পৌঁছে না, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ্জ, ২২:৩৭)। এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে কুরবানি কোনো বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং তা অন্তরের খাঁটি ইচ্ছা, নিষ্কলুষ ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধের এক অনুপম বহিঃপ্রকাশ। জীবনের প্রিয় বস্তুকেও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ করতে শিখিয়ে দেয় এই ইবাদত। মানুষকে আত্মসংযম, ধৈর্য ও নির্মোহতার অনুশীলনে অভ্যস্ত করে তোলে।

তবে কুরবানির গুরুত্ব কেবল আধ্যাত্মিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়। বাংলাদেশে কুরবানির মৌসুম ঘিরে গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চক্র, যার প্রভাব দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর ঈদুল আজহায় প্রায় এক কোটি পশু কুরবানির জন্য বাজারে আসে—গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া। এ বিপুল সংখ্যক পশু প্রস্তুত করতে বছরের শুরু থেকেই কৃষক ও খামারিরা নেমে পড়েন যত্ন ও পরিকল্পনায়। দেশজুড়ে সক্রিয় রয়েছে প্রায় এক লাখ ছোট-বড় খামার। এই খাত জুড়ে কাজ করে লাখ লাখ মানুষ—পশু খাদ্য উৎপাদন, চিকিৎসা, খামার ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিক্রয় ও বিপণন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে।

কুরবানির সময় দেশের শহর ও গ্রামে বসে হাজারো অস্থায়ী পশুর হাট। এসব হাটে ঘটে বিশাল অংকের আর্থিক লেনদেন, বাড়ে পরিবহন খাতে চাহিদা। ট্রাক, পিকআপ, ভ্যান এমনকি নৌপথেও পশু পরিবহনে ব্যস্ত সময় কাটায় হাজার হাজার শ্রমিক। পাশাপাশি হাট ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয় নিরাপত্তাকর্মী, সেবাকর্মী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকেরা। পশু কেনাবেচার এই পুরো চক্রই দেশের অর্থনীতিকে দেয় এক তাৎক্ষণিক গতি।

এছাড়া কুরবানির সময় একাধিক খাত হয়ে ওঠে সরাসরি লাভবান। কসাই পেশার লোকজনের আয় কয়েকগুণ বাড়ে; মাংস কাটা, সংরক্ষণ, বিতরণ এবং হিমায়নের কাজ করে বহু মানুষ। দড়ি, ছুরি, বটি, গামছা, প্লাস্টিকের বালতি, পলিথিন ইত্যাদির বিক্রিও বেড়ে যায়। বাসাবাড়ির পরিচ্ছন্নতা ও মাংস বহনের কাজেও অস্থায়ীভাবে অনেক শ্রমজীবী আয় করতে পারেন। এই মৌসুমে আয়ের যে সুযোগ তৈরি হয়, তা দেশের অগণিত প্রান্তিক মানুষকে স্বস্তি দেয়।

চামড়া শিল্পের জন্য কুরবানির মৌসুম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের অন্যতম রপ্তানিনির্ভর খাত চামড়াশিল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ কাঁচামাল আসে এই সময়। যদিও চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পাওয়া ও সঠিক সংরক্ষণের ঘাটতি মাঝে মাঝে এই খাতে সংকট তৈরি করে, তবুও এর সামগ্রিক আর্থিক গুরুত্ব অপরিসীম।

অনানুষ্ঠানিক হিসেবে ধারণা করা হয়, কুরবানিকে ঘিরে বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। খামারি, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, কসাই, চামড়া শ্রমিক—সব খাতেই এই মৌসুমি অর্থনীতির স্পর্শ পড়ে। এটি একটি “ঈদ-নির্ভর অর্থনৈতিক বুম”—যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে, নগরজীবনেও বাড়তি সক্রিয়তা আনয়ন করে।

সব মিলিয়ে, কুরবানি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়—বরং তা এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুশীলন, আর একই সঙ্গে একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। ইব্রাহিম (আঃ)-এর জীবন, তাঁর কুরবানি, এবং তাকওয়ার বার্তা আমাদের শেখায়—ত্যাগই মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ। আর কুরবানি আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে সেই ত্যাগের একটি বাস্তব রূপ, যেখানে অন্তরের বিশুদ্ধতা ও সমষ্টিগত কল্যাণ একে অপরকে সম্পূরক করে তোলে।


এই যুগে, যখন ধর্মের তাৎপর্য অনেক সময় বাহ্যিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন কুরবানির গভীর তাৎপর্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আত্মত্যাগ, তাকওয়া, এবং সামষ্টিক কল্যাণই ইসলামের মূল শিক্ষা। কুরবানি হোক না শুধু ছুরির কাজ নয়—হোক আত্মার ঘষামাজা, হোক সমাজের ভারসাম্য রক্ষার এক মর্যাদাপূর্ণ আয়োজন।




Saturday, 12 April 2025

কেন আরব নেতারা গাজার ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করছেন না

Picture: Arab Leaders (Internet)


গাজায় চলছে ২১ শতকের সবচেয়ে নিষ্ঠুর, নির্মম ও পরিকল্পিত গণহত্যা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের একটি সশস্ত্র অভিযানের জবাবে ইসরায়েল যে মাত্রায় সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা যে কোনো মানবিকতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ কেউই রেহাই পাচ্ছে না এই দমননীতি থেকে। হাসপাতাল, স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, এমনকি অ্যাম্বুলেন্স ও সেচ্ছাসেবী মানবাধিকার কর্মী, সবই ইসরায়েলি স্থলাভিজার এবং বিমান হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এটিকে এককথায় ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।


তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত গাজায় ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার শিশু, ৩৯ হাজারের বেশি শিশু অনাথ, আহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজার, এবং গাজার ৯০ শতাংশ মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত। এটি নিছক কোনো যুদ্ধ নয়; এটি একটি একতরফা হত্যাযজ্ঞ, যেখানে অস্ত্রহীন সাধারণ মানুষ একটি পরাশক্তিধর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিষ্ঠুর আক্রমণের শিকার।


এই বাস্তবতায় গোটা বিশ্ব যখন ন্যায় ও মানবতার পক্ষে রাস্তায় নেমেছে, তখন আরব বিশ্বের নিস্তব্ধতা অনেক বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে। ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াতে এতটাই দ্বিধান্বিত বা নিরুৎসাহী কেন আরব নেতারা?


বলা হয়, আরবরা আজ নির্লিপ্ত। কিন্তু ইতিহাসে এমনটা সবসময় ছিল না। ফিলিস্তিন প্রশ্নে আরব বিশ্বের একাধিকবার সশস্ত্র জড়িত থাকার প্রমাণ আছে। যেমন ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যৌথভাবে যুদ্ধ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল সদ্য ঘোষিত ইসরায়েল রাষ্ট্রকে প্রতিরোধ করা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।



১৯৫৬ সালে সুয়েজ সংকটে মিসর ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল এক ধাক্কায় গাজা, পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গোলান হাইটস দখল করে নেয়। ১৯৭৩ সালে ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে মিসর ও সিরিয়া আবার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তবে প্রতিটি যুদ্ধেই দেখা গেছে একটি ব্যাপার—আরবদের মধ্যে নেতৃত্বের সংকট, কৌশলগত বিভ্রান্তি এবং পারস্পরিক আস্থাহীনতা। এসব দুর্বলতাই যুদ্ধগুলোকে সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারেনি।


বর্তমানে আরব রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান অনেকটাই বদলে গেছে। অধিকাংশ রাষ্ট্র এখন রাজতন্ত্র বা স্বৈরশাসনের আওতায় পরিচালিত হয়। এই সরকারগুলো তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অনেকাংশে নির্ভরশীল পশ্চিমা শক্তির উপর—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের।


যুক্তরাষ্ট্র আবার ইসরায়েলের প্রধানতম মিত্র। ফলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রকে বিরূপ করা। এটি আরব নেতাদের জন্য কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই তারা মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিতে ভয় পান।


আরব বিশ্বের প্রতিক্রিয়ায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে এখনো তেলনির্ভর। ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিক্রিয়ার শঙ্কায় তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন ইতিমধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এমন অবস্থায় গাজা ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়া তাদের কূটনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।



হামাসকে ঘিরে আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট দ্বিধাদ্বন্দ্ব। মিশরের দৃষ্টিতে হামাস শুধু ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন নয়, বরং মুসলিম ব্রাদারহুড সংশ্লিষ্ট একটি চরমপন্থী গোষ্ঠী, যেটি তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও হামাসকে পুরোপুরি সমর্থন করে না। বরং তারা এই গোষ্ঠীকে ইরানঘনিষ্ঠ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে। তাই গাজায় চলমান মানবিক সংকটে তারা এক ধরনের কৌশলগত নীরবতা বজায় রেখেছে—যাতে নিজেদের অভ্যন্তরে উত্তেজনা না বাড়ে এবং পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গেও সম্পর্ক নষ্ট না হয়।


আরব বিশ্বের বর্তমান সংকটে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো নিজেদের মধ্যে ঐক্যের অভাব। একদিকে কাতার, ইরান ও তুরস্কের মতো দেশগুলো হামাসকে প্রকাশ্যে সমর্থন করছে, অন্যদিকে সৌদি আরব, মিশর ও আমিরাত অনেকটাই নিরপেক্ষ কিংবা নীরব ভূমিকায় রয়েছে। এর পেছনে যেমন রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হিসাব, তেমনি রয়েছে জিওপলিটিকাল এবং অর্থনৈতিক চাপের বাস্তবতা।


এই বিভক্তির কারণে ফিলিস্তিন সংকটে আরব দেশগুলো একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে বিশ্ব মঞ্চে হাজির হতে পারছে না। অথচ ইতিহাস বলছে—যদি আরব রাষ্ট্রগুলো রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে একজোট হতে পারত, তবে যুদ্ধ ছাড়া আরও অনেক কৌশলেই ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কার্যকর অবস্থান নেওয়া সম্ভব হতো।


প্রয়োজনে তারা সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও বেশ কিছু দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে পারত। যেমন—গাজায় জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা ও খাদ্য সহায়তা পাঠানো, আন্তর্জাতিক মহলে সংগঠিত কূটনৈতিক চাপ তৈরি করা, কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করে একটি দৃঢ় বার্তা দেওয়া—এসব কিছুই তাদের হাতে ছিল। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব কোনোটিই তারা করছে না। এমনকি আরব লীগের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো অবস্থান বা পরিকল্পনা সামনে আসেনি।


২০২৩ সালের ১১ নভেম্বর রিয়াদে আয়োজিত এক যৌথ আরব-ইসলামিক শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে এই সংকটে একটি সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলো কীভাবে এবং কোন কৌশলে এই সংকট মোকাবিলা করবে—সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট রূপরেখা বা ঐক্যমত্য গড়ে উঠেনি। সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে ইসরায়েলকে চলমান মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করা হলেও, তাতে কার্যকর কোনো সমন্বিত পদক্ষেপ বা কৌশলগত সিদ্ধান্ত উঠে আসেনি।


এর ফলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অবস্থানে পার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, লিবিয়া ও ইরাক ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করলেও, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো, মিশর ও জর্ডান তাদের বক্তব্যে অনেক বেশি সংযত ও কৌশলগত অবস্থানে ছিল। এমনকি সিরিয়া ও জর্ডানের মতো দেশগুলো, যারা একসময় ফিলিস্তিন ইস্যুতে সরব ছিল, তারাও এবার অনেক বেশি সতর্ক ও পরিমিত ভঙ্গিতে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে।


এই মুহূর্তে পৃথিবীর নানা প্রান্তে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হোক বা ইউরোপ-আমেরিকার রাজপথ, সাধারণ মানুষ গাজার পক্ষে সোচ্চার। আফ্রিকার শহরগুলোতেও মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। কিন্তু আরব বিশ্বের নেতৃত্ব—যারা ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিনের পাশে থাকার দাবি করে—তারা এখন শুধু উদ্বেগ প্রকাশ করেই থেমে থাকছে। মানবতার কথা বললেও, বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ তারা নিচ্ছে না।


গাজায় একের পর এক হাসপাতাল, স্কুল, আশ্রয়কেন্দ্র ধ্বংস হচ্ছে। পানি, বিদ্যুৎ, ওষুধ—সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ যেসব রাষ্ট্র এক সময় নিজেদের ‘উম্মাহ’র নেতা দাবি করত, সেই আরব রাষ্ট্রগুলো এখন চুপ। তারা বিবৃতি দিচ্ছে, তীব্র নিন্দা করছে, কিন্তু কোনো বাস্তব পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এটা শুধু কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক ব্যর্থতা নয়, এটা এক ধরনের নৈতিক পতনও।


নিজেদের স্বার্থ, নিরাপত্তা, অথবা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ঠিক রাখার অজুহাতে আরব নেতৃত্ব যদি এক জাতির নিধনের সময় নিশ্চুপ থাকে, তাহলে সেটা শুধুই ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয়—তারা নিজেদের ইতিহাসকেও প্রতারণা করছে। ফিলিস্তিন ইস্যু শুধু রাজনৈতিক সংকট নয়, এটা মানবিক সংকট। এই অবস্থায় নিরবতা মানে নিষ্ঠুরতার সঙ্গে সমর্থন।


আজকের আরব নেতৃত্ব হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য শক্তিধর দেশের চাপ সামলে চলতে চায়, কিন্তু ইতিহাস এমন নিষ্ক্রিয়তাকে ক্ষমা করবে না। সাধারণ মানুষ যখন মৃত শিশুদের ছবি দেখে চোখের পানি ফেলছে, তখন আরব নেতাদের চুপ করে থাকা ভবিষ্যতের প্রজন্মের চোখে এক লজ্জাজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Thursday, 2 January 2025

The Teacher-Student Centre: The Heartbeat of Dhaka University


At the heart of Dhaka University's campus, the Teacher-Student Centre, or TSC, stands as not just an architectural landmark. It is a cultural and extracurricular center, a student sanctuary, and a testament to Bangladesh's rich heritage and spirit of life and liberty.

Since its establishment in 1961, TSC has been the beating heart of university life, bringing students and teachers together into a space designed for growth, dialogue, festivals, culture, and unity.

The story of TSC is woven into the political, social, and historical context of Bangladesh. Built with funding from the Government of Pakistan and the Ford Foundation, the TSC complex occupies a historic site, formerly the grounds of the Sujatpur Palace, a Nawab's palace. TSC's proximity to Suhrawardy Udyan, once a racecourse ground and now one of Dhaka's largest public parks, echoes its deep connection with Dhaka's past.

TSC's architectural design is an inspired blend of modernist and traditional styles, created by Greek architect
Constantinos Doxiadis. In keeping with Bangladesh's climate and community-based culture, the building is arranged around open courtyards, gardens, and an artificial fountain, one side of which is covered with a butterfly canopy that helps keep the building cool even in Dhaka's intense summer heat.

To the east of the main TSC building is a small Greek tomb, built in 1915, with inscriptions in classical Greek. The monument offers a rare connection to Dhaka's multicultural past and is one of the last remnants of the city's small Greek community from the last century, adding historical depth to the TSC complex. Along with that, there are two old Hindu monasteries in the swimming pool site.

Beyond its architectural charm, TSC is cherished as a haven for students to take a break from academic life. Here, formal education is complemented by a vibrant cultural, social, and intellectual environment.

Various student organizations operate from TSC, including the Dhaka University Journalists Association, Dhaka University Scout Den, Dhaka University Debating Society, Dhaka University Film Society, Dhaka University Quiz Society, Dhaka University Photographic Society, Dhaka University Readers Association, Dhaka University Environment Society, Dhaka University Research Society, and others. Together, these groups create a sense of community and shared purpose, bringing students from diverse backgrounds together in collaboration and friendship.

After the building was established, every type of social and political movement, including the War of Independence and the July Uprising, became a meeting place where students, professors, and activists gathered to discuss and plan for the country's well-being. This legacy of resistance and unity still lives on, as students use the same space to discuss contemporary issues.

During national crises, such as the devastating floods of 1987 and Cyclone Sidor in 2007 and the recent country's worst floods in 2024, TSC became a rallying point for student-led mass relief efforts, organizing and distributing food, medical supplies, and other resources from this central location. TSC also serves as the headquarters of Badhan, a blood donation organization run by Dhaka University students who coordinate regular blood donation drives to support local hospitals.

Renowned for its cultural programs, TSC’s various organizations regularly organize exhibitions, film screenings, reunions of ex-students, poetry readings, and art competitions, creating an open platform for budding artists, poets, filmmakers, and activists. The largest Bengali film festival takes place here during the full month of the language movement, February. Here the central orientation of the novice students is arranged every year. 

On the front outside of TSC, you will find several types of tea rooms with various kinds of teas where students take the test of hot teas and enjoy their academic lives chatting with their friends. The teas here are very familiar to over the capital. If you are in the corridor of the TSC, you will see various types of groups of students who may be chatting, practicing songs and dances, taking preparation for their presentations and assignments, and so on.

On the backside of the swimming pool area, there is an open school run by the students for the facility-derived street children. It is one of the best vivid places in the Dhaka University campus and all over the city, which will not be able to be recognized and guessed without part of it.

The memories of university lives can be vague, but not the days of TSC for the students of the University of Dhaka.

রক্তঋণের ভাষা: বাজারের যুগে বাংলার জ্ঞান-স্বাধীনতার লড়াই

ফাল্গুনের এই স্মরণীয় মাসে ১৯৫২  ( ১৩৫৮  বঙ্গাব্দে)  সালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আবারও আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে...