আজ ৯ ডিসেম্বর ২০২৫, রোকেয়া দিবস। জাতীয় ও বিভিন্ন পর্যায় থেকে উদ্যাপিত হয়েছে দিনটি।
সারাদিন, আমার ব্যক্তিগত, অ্যাকাডেমিক, এবং টুকটাক প্রোফেশনাল জীবন নিয়ে বেশ কেটে গিয়েছে দিনটি। সন্ধ্যায় সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করে দেখি বেগম রোকেয়াকে নিয়ে বেশ উত্তপ্ত নিউজ ফিড। তাঁর বিরোধীদের
বক্তব্য ও প্রচারণায় বেশ চোখে পরার মতো। আমি সচরাচর ইত্যাদি আধেয় এড়িয়ে চলি,
তবে আজ লিখছি।
আমি একটা
জিনিস বেশ জোর দিয়ে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশে যারা তাঁকে
মাথায় নিয়ে নাচে এবং যারা পায়ের তলায় পিশতে চায় তাদের শতকরা ৯৮ জন বেগম রোকেয়ার লেখা
আগাগোড়া পড়েনি।
আমার
‘সৌভাগ্যক্রমে’ কিংবা ‘দুর্ভাগ্যক্রমে’ তাঁর লেখাগুলো পড়ার সুযোগ হয়েছিল। তাঁকে আমার
কাছে কখনোই এড়িয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তিত্ব মনে হয়নি। বরং তাঁকে আমি বেশ শ্রদ্ধা করি এবং
বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁকে কৃতিত্ব দিতে চাই।
একজন
শিক্ষার্থী হিসেবে তাঁকে আমি সর্বদায় আমার নিরপেক্ষ ক্রিটিকেল অবস্থান থেকে দেখতে পছন্দ
করি। কখনো তাঁকে পূজনীয় মনে হয়নি, আবার কখনো মনের কোণে তাঁর
প্রতি বিন্দু পরিমাণ বিদ্বেষ সৃজন হয়নি। আমি তাঁকে অন্যান্য লেখক, দার্শনিক, গবেষক ও চিন্তককে যেভাবে দেখি,
সেভাবেই দেখার চেষ্টা করি।
আমাদের
মাঝে সহনশীলতার অভাব বেশ দীর্ঘদিনের এবং অনেক তীব্র। আমরা নিজেদের চিন্তার, মতের, বিশ্বাসের, চর্চার,
রুচির, দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে অন্য কোনোকিছু
মেনে নিতে পারি না। এমনকি আমাদের কাছে মানুষের পোশাকের বিষয়েও বেশ কট্টর অবস্থান লক্ষণীয়।
যে কারণে আমাদের মাঝে এমন একটা ভাব বিদ্যমান যে, আমার নিজেরাই
কেবল সত্য, আর দুনিয়ার বাকি সব ভুল। বাকি সবাইকে আমার মতো
হতে হবে। নয়তো আমাদের নিজেদের কারো মতো হতে হবে ঠিক হওয়ার জন্য। আমাদের কাছে আমাদের
ধারণাগুলো এতই অস্পষ্ট যে, আমরা কেবল রেট রেসের মতো কোনো কিছু
অনুসরণ করে যাই। এক দণ্ড দাঁড়িয়ে চিন্তার অবকাশ পায় না।
আজকাল
আমার কাছে মনে হয়, বেগম রোকেয়াকে নিয়ে আমাদের মাঝে এক ধরনের
উগ্রতা পরিলক্ষিত। যে-কোনো বিষয়ে বেগম রোকেয়াকে টেনে তাকে গালি দেওয়ার এক ধরনের চর্চা
আমাদের মাঝে দেখা যাচ্ছে। ৫ই আগস্টের পর হয়ত কিছুটা বেড়েছে। তবে আমার কথা হলো : বেগম
রোকেয়া তো আর গালি জীবনে কম খাননি। তাঁর মৃত্যুর পরও এই চর্চা আমাদের সমাজ অব্যাহত
আছে। তবে তাঁর ইচ্ছাগুলো কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। যদিও আমাদের দেশে তাঁকে
নিয়ে আরো গঠনশীল কাজ করার সুযোগ ছিল, তবে ঠিক করে হচ্ছে না
বলে আমার ধারণা। আর অন্যান্য নারীদের অবস্থা আরো সূচনীয়।
তাঁকে
ধর্মবিদ্বেষী বলে প্রচার করার প্রচেষ্টা একটি পুরাতন হাতিয়ার। আজ বেশ কয়েকটি পোস্ট
দেখলাম তাঁকে ইসলাম বিদ্বেষী বলে প্রচার করা হচ্ছে। তবে এই ব্যাপারে আমার কিছু ব্যক্তিগত
অভিমত রয়েছে। তিনি ইসলাম ধর্মকে প্রমুট করে বেশ লেখা লিখেছেন। তিনি সর্বদাই ধর্মান্ধদের
অপপ্রচারের শিকার হয়েছেন, যেহেতু তিনি ধর্মের নামে নারীদের উপর করা
জুলুমের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন, কলম ধরেছেন, পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইসলাম ধর্ম যে অধিকার
নারীকে দিয়েছে সে অধিকারও আমাদের সমাজের পুরুষগণ নারীদের বঞ্চিত করেছেন। এই চর্চা এখনো
বিদ্যমান। বাংলার ঘরে ঘরে নারীর উপর পুরুষ কতৃত্বের অপব্যবহার করেছে এবং করছে,
এক অপরের প্রতি দায়িত্বের বরখেলাপ করছে। তৎকালীন হিন্দু সমাজে সতীদাহ
প্রথার কথা একবার চিন্তা করতে পারেন।
আমার
কাছে বেগম রোকেয়ার লেখা ভালো লাগার দুটি বিশেষ কারণ আছে বলে, হঠাৎ মনে হচ্ছে। এক, তিনি বাংলা সাহিত্যে প্রথম
দিককার কোনো মুসলিম নারী, যিনি স্বজাতির ভাষায় সাহিত্য চর্চা
করেছেন, আর দুই, তিনি সেইসময় যেভাবে
কলম চালিয়েছেন, এখনো আমাদের সমাজের বিভিন্ন অংশে এই ধরনের
চিন্তা করা দুরূহ।
আমার
কাছে তাঁর নিজের লেখা ও তাকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন বই পড়ে, তাঁকে যথার্থ ধার্মিকই মনে হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়, কেন না জানি, আল্লাহ ভালো জানেন, তাঁকে যারা উলঙ্গ সমালোচনা করেন তাঁদের অনেকের অপেক্ষা তিনি ভালো মুসলমানের
ভূমিকায় আবর্তিত ছিল। নিজের মাঝে এক ধরনের মুসলমানি পরিচয় ধারণ করতেন, যা এখনকার আমাদের মাঝে যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আছে তার পাথেয় হতে পারে বলে
আমার ধারণা। আমার মনে হয় এখনো অবধি আমরা ঠিক করে তাঁকে বুঝতে পারিনি। তাঁকে নিয়ে বহির্বিশ্বে
কাজ করার প্রবণতা যতটুকু, সে হারে আমাদের এখানে অপ্রতুল।
আজ একটা
লেখা নিয়ে অনেক প্রচারণা দেখলাম। তিনি বলেছেন “তারপর মহাত্মা মহম্মদ আইন প্রস্তুত করিলেন
যে ‘রমণী সর্ব্বাদায় নরের অধীনা থাকিবে, বিবাহের পূর্ব্বে পিতার কিংবা ভ্রাতার অধীনা, বিবাহের পর স্বামীর অধীনা, স্বামী অভাবে পুত্রের
অধীনা থাকিবে।’ আর মূর্খ নারী নত মস্তকে ঐ বিধান মানিয়া লইল।”
উল্লেখ, লেখাটি বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ‘রোকেয়া রচনাবলী’ (আমার কাছে ২০১৫
সালে প্রকাশিত পূণর্মূদ্রণ সংস্করণটি আছে)-এর ৬১১ পৃষ্ঠায় বিদ্যমান। যা কিনা তাঁর কোনো
গ্রন্থিত লেখার অংশ না। বরং, চিঠি আকার প্রবন্ধটি
(অলঙ্কার না Badge of slavery) ভাগলপুরস্থ
সম্ভ্রান্ত মোসলমান পরিবারের একটি মহিলা হইতে প্রাপ্ত। যেখানে তিনি কেবল ইসলাম ধর্ম
নিয়েই কথা বলেন নি বরং সনাতন, খ্রিষ্ট ইত্যাদি ধর্ম নিয়েও কথা বলেছেন।
আমার
ব্যক্তিগতভাবে উক্ত বক্তব্যের উপর কোনো মন্তব্য নেই। তবে সম্পর্কিত আধেয়ের উপর আমার
কিছু সমালোচনা আছে। তিনি উক্ত চিঠি আকার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, স্রষ্টা কেন পয়গম্বরকে পশ্চিম এশিয়ার (মধ্যপ্রাচ্য বলতে চাই না) কিছু দেশে
পাঠিয়েছেন, কেন তাদের বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে পাঠাননি,
নবিরা কেন এশিয়াতে সীমাবদ্ধ। সে সম্পর্কে আমার মত হলো, এই কথা সত্য নয়। বস্তুত, আল্লাহ তাঁর নবিদের কেবল
এশিয়াতেই প্রেরণ করেনি। তিনি পবিত্র কুরআনে সূরা আল-হুজুরাত (৪৯), আয়াত ১৩-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে আল্লাহ মানুষকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে
বিভক্ত করেছেন, যেন তারা একে অপরকে চিনতে পারে, অহংকার করার জন্য নয়, বরং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল
হতে পারে, কারণ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সেই,
যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু (তাকওয়াসম্পন্ন)। পাশাপাশি তিনি পবিত্র
কোরানে কেবল গুটিকয়েক নবীর নাম উল্লেখ করেছেন। যেখানে শাস্ত্রমতে নবিদের সংখ্যা এক
লক্ষ পঁচিশ হাজারের ন্যায়। সুতরাং তিনি তাদের সারা পৃথিবীতেই ছড়িয়ে দিয়েছেন বলেই আমার
বিশ্বাস।
উল্লেখ, নবি ইউসুফ আ. ও নবি মূসা আ. কিন্তু আফ্রিকাতে ছিলেন দীর্ঘ দিন। আমাদের জাতীয়
কবিও বিবাহের পেছনে আমার ন্যায় একই অবস্থান থেকে হিন্দু ধর্মের অনুসারী নারীকে বিয়ে
করেছিলেন।
আমি অনুরোধ
করব,
কাউকে বুঝতে চাইলে ৬০০ পৃষ্ঠার বেশি একটি বইয়ের (একজন লেখকের লেখারও)
৬০ শব্দেরে আশেপাশের কোনো লেখা পড়ে বিচার করা ঠিক হবে না। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
আমাদের সাহিত্য, চিন্তা ও দর্শনের এক অমূল্য সম্পদ। যিনি আমাদের
সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে দেখিয়েছেন। ধর্মের নামে, অপব্যাখ্যা দিয়ে, অন্যায়কে জায়েজ করে দুনিয়াতে
অপচর্চা করা যায় বটে, তবে আল্লাহর বিচার নিশ্চয়ই যথার্থ। মহান
আল্লাহ পাক বেগম রোকেয়ার পরলোকের সহায় হোক। আমাদের প্রতি রহমত বর্ষিত হোক, যাতে করে আমরা আমাদের মধ্যকার বিভেদ ভুলে সত্য ও ন্যায়ের দিকে অগ্রগামী
হতে পারি।








