Friday, 21 November 2025

ভূমিকম্প ও আমাদের চিন্তার বেহাল দশা


 এধরনের ভূমিকম্প আমাদের প্রজন্ম আগে কখনোই দেখেনি। শেষবার যখন বড় ভূমিকম্প হয় তখন আমার বাড়ির পাশের পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে আজ যমুনা দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তা না হয় আমার জীবন চক্র অন্যভাবেও কাটতে পারতো!

যাইহোক, আমরা যে জাতি হিসেবে কত ‘মূর্খ’ তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে তথাকথিত দেশে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আচরণের মাধ্যমে। যেখানে কেউ কেউ এই দূর্যোগকে ধর্মীয় দৃষ্টি থেকে কেবল দেখছে অন্যদিকে সুযোগ কিছু লজিকেল ফ্যালাসি দিয়ে নিজের হীন স্বার্থ উদ্ধারে ট্রমাটাইজড লোকজনেরৃ মানসিক অবস্থাকে ব্যবহার করছে। যেখানে স্পষ্টতই আমাদের এই দুর্যোগের পর কী ধরণের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, যদি আফটার শক হয় তা হলে কী করতে হবে, দীর্ঘমেয়াদী আমাদের প্রস্তুতি কী হেবে, আমাদের সার্বিক ঘাটতিগুলো কোথায় তা নিয়ে আলোচনা না করে, স্বার্থান্বেষীদের চক্রান্তে আত্ম নিমজ্জিত।

প্রথমত, আজ ভূমিকম্পের পর আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী, অগ্রজ ও অনুজদের কী অবস্থা, বিশেষ করে ‘মৃত্যুঁফাদ‘ আমাদের আবাসিক ভবনগুলোর খবর নিতে ফেইসবুকে যায়। দেখি, একদল দোষারোপ করছে রাজুতে সকামিতার বিষয়ে অবস্থানের কারণে; আরেকদল বলছে বিভিন্ন মাদ্রাসায় বলাৎকারের ঘটনার কারণে এই ভূমিকম্প হয়েছে।

দ্বিতীয়বার ফেইসবুকে ঢ়ুকে দেখি, ওড়না আর প্যান্ট নিয়ে ‘মারামারি’। বিখ্যাত ‘চিন্তাশীল’ সম্প্রদায়ের মধ্যে বাগ্ যুদ্ধ। যেখানে এক নারীর “ভূমিকম্প হইলে মানুষ জান বাঁচায় আর মেয়েরা ওড়না খুঁজে।” এধরনের মন্তব্য নিয়ে বেশ জোর আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে সামাজিক মাধ্যটি জুড়ে।

এখন আসছি, প্রথমবারের কথায়, যেখানে আমাদের দেশের ভূভাগ দীর্ঘসময় যাবৎ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। দীর্ঘ সময় যাবৎ আমাদের কিছু বিশেষজ্ঞ নিয়ে আলোচনাও করছে। পত্র পত্রিকায় কিছু কলামও দেখেছি। তবে এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে চিন্তা করার, আলোচনা করার মানুষ হাতগোনা । আর সারাদিন রিলস দেখা, নর্তকির নাচ দেখা, স্থূল বিষয়াদির প্রতি নিবদ্ধ আলোচনাই সবদিকে। কে কাকে বিয়ে করেছে, কার সাথে কার যৌন-ঘটনা নিয়ে কেলেঙ্কারী হয়েছে, কোথায় কার লিংক ভাইরাল হয়েছে এসব বিষয়েই অধিকাংশ মানুষের চিন্তার অভাব হয় না, খোঁজার প্রয়োজন নেই এসব মানুষের, আমাদের চারপাশে আছে অহরহ।

এই ঘটনার পেছনে সমকামিতার দোষ, নাকি বলাৎকারের দোষ সেটি আল্লাহ পাক ভালো জানেন। আমার চোখে দুটুই সমান অপরাধ। আল্লাহর আইনে বিচার আছে, বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনেও বিচার আছে। বিচার হীনতার সংস্কৃতি ও সুস্থচর্চার অভাবেই আমাদের সমাজে এই ধরণের অপরাধ ও অবস্থা বিরাজ করছে। এখানে একজনের দোষ, আরেকজনকে দিয়ে দোষ কাটানোর কোনো পাথেয় নেই।

এবার আসি দ্বিতীয়বারের কথায়, আমি দু তলায় থাকি। ভূমিকম্পের সময় বেসিনে হাত ধৌত করছে নাস্তা করার জন্য। ভূমিকম্প অনুভূত হতেই আম্মাকে ডেকে বারান্দায় দৌড় দেই। আম্মার হতে ছিল ছুরি আর লেবু। শকটা থামলে আম্মু হাতের জিনিস রেখে বের হতে যাচ্ছে, আর আমায় বলছে চাবির কথা। আমি বললাম চাবি আছে এক রিং আমার পকেটে তুমি রেডি হও। আম্মু যখন জুতা পড়ছে আমি তখন দরজা খুলছি। আর আমি যখন জুতা পড়ছি তখন আম্মু দাড়িয়ে আছে দরজা খুলে। ইতোমধ্যে ছয় তালা থেকে প্রতিবেশিরাও নামে যাচ্ছে আমাদের আগে।

বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। আমাদের ভবনে বিভিন্ন কেসিমের লোকই বসবাস করে। সবাই যারা যার ভাবে নেমে এসেছে। নিচ তলায় নেমে দেখি একজন হাতে করে জুতা নিয়ে এসে পার্কিং-এ দাঁড়িয়ে জুতা পড়ছে। যা আমরা সময় নষ্ট করে বা থেকে পড়ে বেরিয়ে ছিলাম। নিচে সবাই বসায় যা পড়ে সেভাবেই বেরিয়ে এসছি। রাস্তায় দাঁড়িয়ে যারা পর্দা করে তারা মুখে নিকাব দিচ্ছে; কেউ আগে থেকেই পরিপাটি, কেউ সচরাচর যেখাবে থাকে সেভাবেই আছে। স্মৃতি থেকে বলছি। কারণ এরকম মুহূর্তে কেউ কারো পোশাকের দিকে নজর দিচ্ছে না বৈকি। সবাই স্বজনদের কল করে খবর নিচ্ছে। কোলের শিশুকে বাবা কোলে নিয়ে বাচ্চার মাকে স্বান্ত্বনা দিচ্ছে। হতচকিত অবস্থায় কী অনুভূতি হয়েছিল, কে কী করছেল সেসব নিয়ে বলছিল। সবাই ছিল আতঙ্কিত।


এখন কথা হলো, আমার ঠান্ডা মাথায় ঢ়ুকে না যে, পরিবারের কোনো পুরুষ এরকম সময় তার স্বজনকে ওড়নার জন্য চাপ দিচ্ছে। আর যদি এমন কেউ হাইপোথেটিকেললি থেকেও থাকে তাহলে সে তার স্বজনকে বাসায় রেখে নিচে নেমে যাবার কথা না কোনো ভাবেই। আমি কাউকে ডিফেন্ড করছি না। আর যারা ওড়না সবসময় ব্যবহার করে তাহলে তাদের ওড়না তো আর কোথায় সুরক্ষিত আছে যা সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খোঁজে বের করতে হবে। হাতের নাগালেই থাকার কথা।

এই ধরনের, লিজিক্যাল ফ্যালাসি জনমনে কেবল বিভ্রান্তিই সৃজন করবে। যা মূল বিষয় থেকে তাদের চিন্তা ভাবনাকে ভুল বা সম্পর্কিত তা এমন বিষয়ে প্রবাহিত করবে। কারো ব্যক্তিগত ধারণাকে ধর্মীয় লেবাসে মাখিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয় সংস্কৃতির, মূল্যবোধের ক্ষতি হরা হচ্ছে। যেখানে কোনো বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাহীন সংস্কৃতি বিদ্যমান সেখানে এধরনের সার্ফেস লেবেলর আলোচনাই সুভা পায়।

দ্বিতীয়ত, সব বিষয়ে নারীবাদী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা নারীবাদের দীর্ঘ চর্চিত একটি বিষয়। জেন্ডারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এই অন্যতম মূল আধেয় এখানে। উল্লেখ, আমার প্রথমমে কোটেড বাক্যটি পরার পর আমার ‘ রোকেয়া রচনাবলী’-তে পড়া আবরোধ-বাসিনী গ্রন্থটির কিছু গল্পের কথা মনে হলো। আজকাল আবার কিছু অতি পণ্ডিত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। আমার বিশ্বাস তারা রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের সবগুলো লেখা পড়ে নাই। এমনকি যারা তাকে অন্ধভাবে সাপোর্ট করে তাদেরও অধিকাংশ না। যায় হোক, আমি বুঝতে পাররাম এমন সেন্সেটিভ সময়ে এই ধরনের উক্তি জনমনে কীধরণের প্রভাব ফেলবে। ঘটলোও তাই।

তবে বাস্তবতা হলো যুগ বদলেছে। আজ যারা পর্দা করে তারাও কোনো অংশে কম শিক্ষিত নয়। তাদের জীবনাদর্শ, পড়াশোনা ও চিন্তাভাবনাও বেশ তীক্ষ্ণ আনেক ক্ষেত্রে । আমাদের এখানে সমস্যা হলো কেউ কারো সম্পর্কে সুষ্ঠাভাবে জানে না, কেউ কাউকে অধ্যয়ন করে না। সহিষ্ণুতা আমাদের এখানে বেশ সীমিত। সবাই ভাবে আমাটা ঠিক আর বাকি সব বেঠিক।  

এখন আসা যাক আমাদের এই মদনমুখী আলোচনা আমাদের কী কাজে লেগেছে? জাপানে প্রতিদিন গড়ে ২ থেকে ৩টি ভূমিকম্প হয়, তবে এগুলোর বেশিরভাগই এত মৃদু যে তা অনুভব করা যায় না। তবে বছরে প্রায় ১,৫০০টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়, যার মধ্যে অনেকগুলোই শনাক্ত করা যায় না। সাধারণত, রিখটার স্কেলে ৩.০ থেকে ৩.৯ মাত্রার ভূমিকম্পগুলোই বেশি ঘটে, যেখানে বছরে প্রায় ১৬০টি ভূমিকম্প ৫.০ বা তার বেশি মাত্রার হয়ে থাকে।

আল্লাহর রহমতে, আমাদের এখানে সেইধরনের ভৌগোলিক বাস্তবতা অনুপস্থিত, তবে এও সত্য যে আমাদের দেশ, গঙ্গা নদীর বেসিন, পৃথিবীর অন্যতম প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকা। যেখানে ১৯৭০ সালে ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশে যে এক নিরব বৈপ্লবিক সাফল্য অর্জন করেছে সেরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতি জরুরী। আজ শিশুরাও ভূমিকম্পের পর দৌড়ে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করার তথ্য জানে, যা বেশ কয়েকজন ৪০/৫০+ লোকের না জানার মতো অবস্থা দেখেছি। যেখানে তাদের পাঠ্যবইয়ে এইসব বিষয় শিক্ষা দেওয়ার ফল।  

এমন এক সময়ে আমাদের ঘর থেকে বের হয়ে খোলা আকাশ পাওয়া দুঃসাধ্য এক অবস্থা। যারা পুরান ঢাকায় নিহত হয়েছে তারা বাসা রেলিং ধদে নিহত হয়েছে। আমি জানি না তারা কি ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিনা। আমি অনেককে ঘর থেকে বেরিয়ে রেলিং-এর নচেই দাড়িয়ে থাকতে দেখেছি। কারণ ঢাকা শহরে খোলা জায়গার বড়ই অভাব। উপশহরগুলোরও একই অবস্থা হচ্ছে।

ভূমিকম্প আজ মানুষদের অনেকেই মৃত্যু ভয়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির কাছে যে মানুষ কত তুচ্ছ তা আজ ভূমিকম্পে আবার অনুভূত হয়েছে ঢাকাও আশেপাশের এলাকার মানুষের কাছে। তবে প্রকৃতির সাথে অভিযোজনের মাধ্যমেই মানুষ নিজের সভ্যতাগুলো গড়ে তুলেছে। পৃথিবীতে অবস্থান করছে সহস্রাব্দ যাবৎ। আমাদের এই-ধরনের ভূমিকম্প বা প্রাকৃতিক দূর্যোগের হাত থেকে বাচাঁর জন্য যতটুকু সম্ভব পূর্ব-প্রস্তুত নিতে হবে। সবকিছু ডিভাইন না ভেবে বাস্তবের সাথে  নিজেদের সম্পৃক্ত করাই কাম্য এখানে। পাশাপাশি নিজের হীনস্বার্থ ব্যাতিরেকে সার্বিক কল্যাণের দিকেই মনোনিবেশ করাই করণীয়।

A rescue official clears the debris from roof and wall collapse after an earthquake in Dhaka, Bangladesh, November 21, 2025 [Abdul Goni/AP Photo]

আমাদের মাঝে বিভেদ যতস্পষ্ট, আমাদের কল্যাণ ততই দূরবর্তী। আমাদের এখন ঠুটকু জিনিস অপেক্ষা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন। আমাদের শহেরে কতটুকু জায়গা খোলো থাকবে, কতটুকুতে মানুষ আবাসন বানাবে, সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য নগরীতে কীভাবে একটু শ্বাস নেওয়া যাবে। আমরা ইতোমধ্যে দেরি করে ফেলেছি। আমাদের সমস্যার সমাধান আমাদেরই করতে হবে। এই লক্ষ্যে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে। জনতা সরকারের উভয়েরই দায়বদ্ধতা আছে এখানে।

শেষ করতে চাই নবী (স.)- এর একটি হাদিসের মাধ্যমে। "যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কিয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে, যা রোপণ করা যায়, তবে সেই চারাটি রোপণ করবে" (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৪৭৯)। আল্লাহ আমাদের নেক বুদ্ধি নসিব করুক, দুর্যোগ অপেক্ষা হেফাজত করুক।

No comments:

Post a Comment

আজ রোকেয়া দিবস

  আজ ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ , রোকেয়া দিবস। জাতীয় ও বিভিন্ন পর্যায় থেকে উদ্‌যাপিত হয়েছে দিনটি। সারাদিন , আমার ব্যক্তিগত , অ্যাকাডেমিক , এবং টুকটাক...